শিক্ষাঙ্গন 

১৬ কোটি মানুষের মাথা থেকে মুছে যাক প্রশ্ন ফাঁসের দুশ্চিন্তা

১৬ কোটি মানুষের মাথা থেকে মুছে যাক প্রশ্ন ফাঁসের দুশ্চিন্তা

পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস অনেক বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষা শুরু হলেই সবার মনের অজান্তে প্রশ্ন ফাঁসের দুশ্চিন্তা চলে আসে। প্রশ্নফাঁসের গুজবকেও অনেকে সত্যি মনে করে তার পেছনে ছুটতে থাকে। সারা বছর পড়াশোনা করে স্বাভাবিক নিয়মে স্বস্তিতে পরীক্ষা দেয়ার পরিবর্তে বিকৃত চিন্তা-ভাবনা তার ভেতরে প্রবেশ করে। অনেক অভিভাবক তার সন্তানের হাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রটি তুলে দেয়ার অপচেষ্টা করে থাকেন।

যেসব জাতি চিন্তা ও মননে খাঁটিত্ব অর্জন করতে পেরেছে, তাদের শিক্ষার্থীরা সানন্দে শিক্ষা লাভ করে, পরীক্ষার্থীরা মন থেকে পরীক্ষা দিতে চায় বলে কোনো পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হবে বা হতে পারে বলে তারা ভাবেই না।

অনেকে ইউরোপ-আমেরিকার উদাহরণ টেনে প্রাথমিক সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, দাবিও জানিয়েছেন। কিন্তু পরীক্ষাগুলো তুলে দিলেই কি প্রশ্ন ফাঁসের মতো জঘন্য কাজটি বন্ধ হবে?

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করার জন্য তো নয়ই, আনন্দের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের শিক্ষালাভ নিশ্চিত করার জন্যও এসব পরীক্ষা তুলে দেওয়ার দরকার নেই। জরুরি প্রয়োজন পরীক্ষাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করে ফলাফল, বিশেষ করে জিপিএ-৫-এর পেছনে ছোটাছুটি বন্ধ করা। প্রাথমিক সমাপনী বা জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেলে তা যে কোথাও বেঁচে কিছু কেনা যাবে না, তা বোঝা কঠিন বিষয় নয়। তাহলে কি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল চাইবেন না শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকেরা?

অবশ্যই ভালো ফলাফল চাইবেন, কিন্তু জিপিএ-৫-এর পেছনে দৌঁড়াতে গিয়ে পঞ্চম আর অষ্টম শ্রেণির শেষভাগে নতুন পাঠ্য বিষয় পড়া বাদ দিয়ে শুধু পূর্ব পঠিত বিষয়ের প্রশ্নোত্তর আর কোচিংয়ে সময় নষ্ট করতে হবে কেন? স্বাভাবিকভাবে নতুন নতুন পাঠ্য বিষয় পড়ে গেলেই পরীক্ষায় ফলাফল ভালো হওয়ার কথা।

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধকল্পে সুনির্দিষ্টভাবে কী কী করা যায়? আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠা এবং পবিত্র চিন্তা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

প্রথমে দেখতে হবে শিক্ষা বিভাগের কোনো স্তরে কারও মাথায় এমন বাজে চিন্তা ঢুকে আছে কি না যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া তেমন খারাপ কিছু নয় বরং এ কাজ করে কিছু অর্থ উপার্জন সম্ভব এবং পরীক্ষায় বেশি ভালো ফলাফল দেখানো যেতে পারে (একটি অসম্ভব কল্পনা!)। জাতি বিনাশী এরূপ জঘন্য চিন্তা কারও মাথায় থাকলে তা এই মুহূর্তে ঝেড়ে ফেলতে হবে।

পরবর্তী কাজ হবে প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন, কম্পিউটার কম্পোজ, মুদ্রণ, সংরক্ষণ ও বিতরণের মতো প্রাথমিক উৎসের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনবল মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগদান। ফেসবুক, ই-মেইল, মোবাইল মেসেজিং ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের গৌণ উৎস বলে জানা যায়। সুতরাং এসব মাধ্যম যদি কোনোভাবে (যেমন কম্পিউটার কম্পোজার বা ট্রেজারির পাহারাদারের কাছ থেকে) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রাথমিক উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয় শুধু তাহলেই এসব বন্ধ করা প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধের একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

জাতির সামনে অনুসরণীয়-অনুকরণীয় জীবিত মডেলের অভাব বাংলাদেশের জন্য একটি চরম দুর্ভাগ্য। দেশের কলুষিত সামাজিক পরিবেশে চরিত্র ঠিক রাখা পরম নীতিমানদের জন্যও কঠিন হতে পারে। তাই কোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে কোন পয়েন্টে কার মাধ্যমে সেটি ঘটেছে, তা বিচার বিভাগীয় তদন্তে উদঘাটন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পরে এ কাজের সঙ্গে জড়িত কারোর আর চারিত্রিক স্খলন না ঘটে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগ করে প্রশ্নপত্র নির্ধারণ, ছাপানো, ফয়েল কাগজে প্রশ্নপত্র প্রেরণ এবং বিতরণ পদ্ধতি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির মূল কমিটি থেকে শুরু করে পরীক্ষা কেন্দ্রর কমিটি পর্যন্ত কয়েক হাজার লোক জড়িত থাকেন। তাদের যদি প্রযুক্তি ব্যবহার ও দক্ষতার অভাব থাকে, ট্রেকিং ডিভাইস থেকে শুরু করে প্রশ্নপত্র ফাঁস হবার জন্য সম্ভাব্য যত ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও কৌশল আছে, যা এদেশে এখন সহজলভ্য, তার ধারণা না থাকে, তাহলে আরও বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে ব্যয়বহুল হলেও কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পূর্বনির্ধারিত প্রশ্নব্যাংক থেকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রশ্নসেট নির্ধারণ, পরীক্ষা কেন্দ্রেই অটোমেশন পদ্ধতিতে প্রশ্ন ছাপানো এবং ফয়েল কাগজে প্রশ্নপত্র প্রেরণ অবশ্যই ভাল উদ্যোগ।

প্রস্তাবিত কৌশলগুলো জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি এবং সমমানের পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা, যা প্রয়োগ করলে অসাধু লোকগুলো অবৈধ পথ থেকে সরে দাঁড়াবে। তাদের মাথা থেকে প্রশ্ন ফাঁস করার চিন্তা মুছে যাবে। শুধু তাই নয়, দেশের ১৬ কোটি মানুষের মাথা থেকে মুছে যাবে প্রশ্নফাঁস হওয়ার দুশ্চিন্তা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফিরে আসবে স্বস্তি।

Related posts

Leave a Comment

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com