সাহিত্য ও সংস্কৃতি 

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির প্রাণের উৎসবের শুরুর গল্প

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির প্রাণের উৎসবের শুরুর গল্প

বছর ঘুরে আবারো এলো পহেলা বৈশাখ। বাংলা ১৪২৫ সালকে বিদায় দিয়ে নতুন বাংলা বছর ১৪২৬ সালকে নানা রকম অনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে স্বাগতম জানাচ্ছে বাঙালি জাতি। বাংলার ঘরে ঘরে আজ উৎসবের আমেজ বইছে। হাজারো বাঙালি প্রাণের মেলবন্ধন হচ্ছে বৈশাখের আয়োজনে। নতুন শুরুর প্রত্যয়ে সবাই গাইছে, ‘যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক/ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’

বাংলা বর্ষের জন্ম হয়েছিল মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে। খাজনা আদায়ের সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে তিনি বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তাঁর নির্দেশে রাজদরবারের জ্যোতিষী ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজী সৌরসাল ও চন্দ্রসালের মধ্যে সমন্বয় করে বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। সেই থেকে বাংলা সন হয়ে যায় বাঙালির। জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে। বাংলা বারো মাস ঘিরে আবর্তিত হতে শুরু করে ঋতু বৈচিত্র্যের সব লীলা খেলা। গ্রামীন জীবনে ফিরে আসে সজীবতা।

বাংলা সনের গণনা শুরু হয় হিজরি ৯৯৩ সনের ৮ রবিউল আওয়াল বা ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ থেকে। গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় হিজরি ৯৬৩ সন বা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। সেই সময় ৯৬৩ চন্দ্র সনকে ৯৬৩ বাংলা সৌর সনে রূপান্তরের মধ্যদিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জির যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ফসলি সন নামে পরিচিতি পেলেও পরে এই সন ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামেই সুপরিচিত হয়ে ওঠে।

আকবরের শাসনামলে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে প্রজাদের সকল প্রকার খাজনা, শুল্ক ও মাশুল পরিশোধ করতে হতো। পরের দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূ-স্বামীরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হতো। উৎসবটি পরিণত হতো সামাজিক অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণের মানুষের উপস্থিতি পরস্পরের মধ্যে তৈরি করতো সম্প্রীতির এক মেলবন্ধন।

প্রকৃতির শাশ্বত নিয়মেই পুরাতনের বিদায়ে ঘোষিত হয় নতুনের আগমন। সব গ্লানি মুছে নবোদ্যমে শুরু হবে পথচলা। বাঙালি স্বাগত জানাচ্ছে ১৪২৬ সালকে। প্রাত্যহিকতার সব জীর্ণ ও পুরাতনকে ফেলে রেখে নবসূর্যের উত্তাপ নিয়ে ১৪২৬ আসুক প্রাণের আশীর্বাদ হয়ে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার। আর সেই প্রত্যাশা করার জায়গাটা থেকেই বাংলা সন বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।

Related posts

Leave a Comment

WP2FB Auto Publish Powered By : XYZScripts.com