সম্পাদকীয় 

দেশ ও জাতির সর্বকালের, সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ।

দেশ ও জাতির সর্বকালের, সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ।

সাঈদ বিন ইসলাম (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়):

যার জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামক কোন দেশ থাকত না,যার কোটি বাঙালির অধিকার থাকত না,যার জন্ম না হলে কোটি বাঙালি তাদের স্বাধীনতার স্বাদ পেতো‌ না, তিনি হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
কোটি বাঙালির হৃদয়কুঠিরে জায়গা করে নেওয়া সেই অবিনাশী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯ তম জন্মবার্ষিকী আজ।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সাহেরা খাতুনের কোলে বাঙালির বহু শতাব্দীর পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে শান্তি ও মুক্তির বারতা নিয়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের জাতির পিতা ও স্বাধীনতার এই মহানায়ক।
১৭ মার্চ বাঙালি জাতির জীবনের এক আনন্দের দিন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। দিনটি সরকারি ছুটি হওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়েও নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। পথঘাট অলিগলিতে বাজবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। জাতির এবং তার পরিবারের সদস্যদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে সারাদেশের মসজিদে দোয়া মাহফিল ও বিভিন্ন উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা সভা হবে। বাংলাদেশ বেতার বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে।

বঙ্গবন্ধুর বাল্যকাল কাটে টুঙ্গিপাড়া গ্রামেই। টুঙ্গিপাড়া প্রথমে কোটালীপাড়া ও পরে গোপালগঞ্জ থানার অন্তর্গত ছিল। মধুমতি আর বাঘিয়ার নদীর তীরে এবং হাওর-বাঁওড়ের মিলনে গড়ে ওঠা বাংলার অবারিত প্রাকৃতিক পরিবেশে টুঙ্গিপাড়া গ্রামটি অবস্থিত। স্বাধীনতা লাভের পর টুঙ্গিপাড়াকে পৃথক থানা করা হয়। টুঙ্গিপাড়া গ্রামেই শেখ মুজিবুর রহমান ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা শস্য শ্যামলা রূপসী বাংলাকে দেখেছেন। তিনি আবহমান বাংলার আলো বাতাসে লালিত ও বর্ধিত হয়েছেন। তিনি শাশ্বত গ্রামীণ সমাজের সুখ দুঃখ হাসি কান্না ছেলেবেলা থেকে গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। গ্রামের মাটি আর মানুষ তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। শৈশব থেকে তৎকালীন সমাজ জীবনে তিনি জমিদার তালুকদার ও মহাজনদের অত্যাচার শোষণ ও প্রজা-পীড়ন দেখেছেন। গ্রামের হিন্দু মুসলমানদের সম্মিলিত সামাজিক আবহে তিনি দীক্ষা পান অসাম্প্রদায়িকতার। আর পাড়া প্রতিবেশী দরিদ্র মানুষের দুঃখ কষ্ট তাকে সারাজীবন সাধারণ দুঃখী মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় সিক্ত করে তোলে। বস্তুতপক্ষে সমাজ ও পরিবেশ তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম করতে শিখিয়েছে। তাই পরবর্তী জীবনে তিনি কোনো শক্তির কাছে সে যত বড়ই হোক, আত্মসমর্পণ করেননি; মাথা নত করেননি।

চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। ৭ বছর বয়সে তিনি পার্শ্ববর্তী গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাইস্কুল, গোপালগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল ও পরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করেন। মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনার সময় তিনি চোখের দুরারোগ্য বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে কলকাতায় তার চোখের অপারেশন করা হয়। এই সময়ে কয়েক বছর তার পড়াশোনা বন্ধ থাকে।

১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় গিয়ে বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং সুখ্যাত বেকার হোস্টেলে আবাসন গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাস করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এ সময়ে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের মতো নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। প্রতিষ্ঠা পান ছাত্র-যুবনেতা হিসেবে রাজনীতির অঙ্গনে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর উদীয়মান রাজনীতিবিদ হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৮ সালে গঠন করেন ছাত্রলীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তরুণ নেতা শেখ মুজিব দলটির যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরে এই সংগঠনটিই মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নাম ধারণ করে এবং শেখ মুজিবুর রহমান কালক্রমে এর ধারক-বাহক হয়েওঠেন। ৫২ সালে ভাষা আন্দোলন ৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও ‘৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনসহ পাকিস্তানি সামরিক শাসনবিরোধী সব আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালির অধিকার আদায় করতে গিয়ে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কেটেছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হন। আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে ১৯৬৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লাহোরে ঘোষণা করেন বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা। ‘৬৯ সালে ঐতিহাসিক গণঅভূ্যত্থানের মধ্য দিয়ে কারামুক্ত করে বাঙালি তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে উপাধি দেন ‘বঙ্গবন্ধু’। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। তারপর স্বাধিকার আন্দোলন ও চূড়ান্ত পর্বে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির একমাত্র পরিত্রাতা। তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ মুক্তির মন্ত্রে দীপ্ত করে বাঙালিকে। তারপর থেকেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলে দেশ। শুরু হয় ‘৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ, রক্তে ভাসে স্বদেশ।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন। মৃত্যুর মুখে প্রাণ তুলে দেয় বাঙালি। মুক্তি জপেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালি তুচ্ছ করে মৃত্যুভয়, পিছু হটায় পাকসেনা, তাদের এদেশীয় দোসরকে। জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালির মণিকোঠায় চিরতরে অঙ্কিত হয় এক কালজয়ী মানুষের মুখ-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন।
সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ১৫ আগস্টের কালরাতে নিজ বাসভবনে ক্ষমতালোভী ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন তিনি।

বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই। আমাদের আছে কিছু শোক। আমাদের আছে একটা কালো দিন। ১৫ই আগস্ট। যিনি পুরো জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করে গেলেন, যিনি আজীবন এই দেশটার মাটি আর মানুষেরে বিশ্বাস করে গেলেন, একটা পর্যায়ে এই দেশের কিছু মানুষই হলো তার ঘাতক। যিনি বলতেন, “আগে আমার দেশ,তারপরে পরিবার।” যিনি দেশের মানুষকেই সবসময় পরিবার ভেবেছেন,নিজের পরিবারকে ঠিকমতো সময় দেয়া হয়ে ওঠেনি তার। শিশু রাসেল পিতা মুজিবকে কাছে না পেয়ে মাকেই মাঝে মধ্যে বাবা বলে ডাকতো। ঘাতকরা কাউকে ছাড় দেয় নি। স্বপরিবারে নিহত করে গেলো সবাইকে, একটুও বুক কাঁপে নি তাদের? একটুও বিবেকে বাঁধে নি তাদের?
বিবেক তো এখনো অন্ধকারে। আজকাল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বলে কেউ কেউ চেঁচান। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিক্রি করে সস্তায় বিবেক বিকিয়ে দিচ্ছেন কেউ কেউ। তাঁরা কি আদৌ জানেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কি?

এক নেতাকে একবার এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আচ্ছা আপনি মুজিব কোট কেন পড়েন?” সেই নেতা জবাব দিয়েছিলেন, “এটা বঙ্গবন্ধু পড়তেন বলে পড়ি, এটা আদর্শ।” আসলে বঙ্গবন্ধু পড়তেন বলে এটি আদর্শ নয়, আদর্শ ছিলো এই কোট পড়ার পেছনের চিন্তাধারায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক ছাত্র একবার তাজউদ্দিনের সাথে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে গেলেন। ছেলেটা অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নেতাকে দেখলেন। হুট করে ছেলেটা বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করলো,”আপনার কোটের বোতাম ছয়টা কেনো? এ ধরণের কোটে বোতাম আরো বেশি থাকার কথা।” প্রশ্ন শুনে নেতা ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “এমন প্রশ্ন আমাকে আগে কেউ করে নাই, তুই প্রথম। এই ছয়টি বোতাম হলো আমার ঘোষিত ছয় ৬ দফার প্রতীক।” এই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা চেতনা, যিনি একটা কোটের মধ্যেও ধারণ করেন বিশ্বাস, দাবি, ন্যায্যতা ।

বঙ্গবন্ধুর ছাত্র থাকা অবস্থায় শুধু ছাত্র না সকলের অধিকারের কথাই ভাবতেন। এখনকার ছাত্ররাজনীতি হচ্ছে “ভাইয়া রাজনীতি” আর “নাউন” এর চেয়ে “বিশেষণ” বেশি ব্যবহার করে খুশি করার রাজনীতি। ব্যক্তিগত ব্যানারের এক কোনায় দেখা যায় না, এমন ধরণের বঙ্গবন্ধুর ছোট্ট এক টুকরা ছবি দিয়ে পোস্টার বানানোর রাজনীতি। নিজে কাজ না করে নেতার প্রোফাইল পিকচার শেয়ার করার রাজনীতি। আর কথায় কথায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বলে নিজেকে দাবি করার প্রতিযোগিতার রাজনীতি। অথচ বঙ্গবন্ধু সেই মহান ব্যাক্তিত্ব যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থাকা অবস্থায় কথা বলেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের পক্ষে। ১৯৪৯ সালে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ডাকা ধর্মঘটে নেতৃত্বদানের অভিযোগে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো। মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব ফেরত পাওয়ার অফার পেয়েও তিনি তার নীতি থেকে একচুলও সরে আসেন নি। এটাই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ।

Related posts

Leave a Comment

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com