অপরাধ ও দুর্নীতি 

জাবি হলে অপহৃত স্কুলছাত্রী, উদ্ধারকারী কে?

জাবি হলে অপহৃত স্কুলছাত্রী, উদ্ধারকারী কে?

জাবি প্রতিনিধি:

‘অপহরণ’ হওয়া রাজশাহীর এক স্কুল ছাত্রীকে উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে রহস্য দেখা দিয়েছে। ওই ছাত্রীকে উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থী ও র‌্যাবের বক্তব্য নিয়েই এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। জাবির একটি হলে ওই ছাত্রী আটক আছে এমন খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী হল প্রশাসনের সহায়তায় তাকে উদ্ধারে নামেন।

পরে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছেন বলে দাবি করেন। অন্যদিকে র‌্যাব-৫ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায় ওই ছাত্রীকে তারা উদ্ধার করেছেন। আর এই দাবির প্রেক্ষিতে উদ্ধারকারী জাবি শিক্ষার্থীরা ভিন্নমত পোষণ করে উদ্ধার অভিযানের ঘটনাটি তুলে ধরেছেন গণমাধ্যমের কাছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, হল প্রশাসনের দেয়া বক্তব্যের সূত্র ধরেই সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘আটকে রাখা বা অপহরণ’ হওয়া শিক্ষার্থী শারমিনকে উদ্ধার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের (আবর্তনের) শিক্ষার্থী নাঈম ইসলাম খান ছিলেন এই উদ্ধার অভিযানের মূলে।

নাইমুল ইসলাম জানায়, নওগাঁ জেলার আত্রাই থানার আত্রাই পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এর ১০ম শ্রেণির ছাত্রী শারমিন নামের একজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা হলে আটকে রাখা হয়েছে। হলের ২১৮ নম্বর রুমে সে আটক আছে বলে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ফোন দিয়ে জানায় এবং ওই ছাত্রীকে উদ্ধারের জন্য সহযোগিতা করার অনুরোধ করে।

নাইম বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে গেটে (ডেইরি গেট) যেতে না পেরে আমরা আশ্রয় নিলাম ভাসানী হলের গেস্ট রুমে। নেওয়াজ শরীফকে (অপহৃত এর কথিত কাজিন) আমরা রিক্সা নিয়ে ভাসানী হলে আসতে বললাম। কিছুক্ষণের মধ্যে সে আসলে আমরা সবকিছু তার মুখ থেকে আরো একবার শুনলাম। সে প্রথমে মেয়েটির কাজিন হিসেবে দাবি করলেও পরে স্বীকার করে যে সে মেয়েটির প্রেমিক। সে আরো দাবি করে যে অপহৃত মেয়েটি গত রাতে তাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে যে তাকে (মেয়েটিকে) চেতনানাশক খাইয়ে ঢাকায় এনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা হলের ২১৮ নাম্বার রুমে আটকে রাখা হয়েছে।’

নাইম আরো বলেন, ‘আমরা বঙ্গমাতা হলের এক বান্ধুবীর সাহায্য নিয়ে জানলাম যে ২১৮ তে একজন এক্সট্রা মেয়ে আছে। তাকে মেয়েটির ছবি দিলে সে ছবির মেয়েটিকেই ওই রুমে দেখেছে বলে নিশ্চিত করে। তখন আমরা সরাসরি প্রক্টর স্যারকে ফোন করি। আর পুরো বিষয়টি অবহিত করি। স্যার আমাদের কথা খুবই আন্তরিকতার সাথে শুনেন এবং সাথে সাথেই ওই হলের প্রোভোস্টকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখবার জন্য বলেন।’

এরপর হল সুপারের উপস্থিতিতে সেই ছাত্রী শারমিনকে ডেকে আনা হয়। শারমিনের দেয়া ভাষ্য মতে, তার খালাতো ভাই তপু তাকে বিয়ে করবার জন্য আগ্রহী। সে তাকে বাসায় নিয়ে যাবার কথা বলে বাসে উঠিয়ে চেতনা নাশক খাইয়ে ঢাকাই নিয়ে আসে। এর মধ্যে তার ফোনটি নিয়ে নেওয়া হয়। তাকে আর কোথাও ফোন করতে দেওয়া হয়নি। তারপর তাকে নিয়ে আসা হয় জাবিতে তপুর (অপহরণকারী) বন্ধুর বন্ধু ৪৩ ব্যাচের একজনের মাধ্যমে মেয়েটিকে রাখা হয় বঙ্গমাতা হলের ২১৮ নাম্বার রুমে রাখা হয়। সেখান থেকে সুযোগ বুঝে কৌশলে তার প্রেমিক ও মায়ের কাছে খবর পাঠায়।

নাইম বলেন, ‘শারমিনের মা ক্যাম্পাসে চলে আসে। আমি তার মার সাথে কথা বলে জানতে পারি তিনি গত রাতেই (উদ্ধারের আগের রাত) ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন এবং ঢাকাই পৌঁছে গেছেন। তিনি (শারমিনের মা) আসলে কোনো পুলিশি ঝামেলা ছাড়াই মেয়েকে মায়ের ও তার পরিবারের হাতে তুলে দিয়ে ডেইরী গেট পর্যন্ত আগিয়ে দিয়ে আসি। সেখানে কোনো র‌্যাব-পুলিশের বিষয় ছিলো না।’

অপরদিকে র‌্যাব সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দাবি করে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সাড়ে ৯টার সময় আত্রাই্ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এর ১০ম শ্রেণির ছাত্রী মিজানা শারমিনকে অপহরণ করা হয়। এই খবর পেয়ে র‌্যাব-৫ তাকে উদ্ধারের সর্বাত্রক তৎপরতা শুরু করে। পরবর্তিতে প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শারমিনের অবস্থান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজিলাতুননেছা ছাত্রী হলে সনাক্ত করা হয়।
নাটোর র‌্যাব ক্যাম্প, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মনির হোসেন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর যৌথ প্রচেষ্টায় ভিকটিমকে উদ্ধার করে নাটোরে নিয়ে আসা হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সাথে একটি ছবিও দেয়া হয়। ছবিতে র‌্যাব সদস্যদের সাথে উদ্ধার হওয়া শারমিনকে র‌্যাব ক্যাম্পে দেখা যায়।

এই খবরে ভিন্নমত জানিয়ে শিক্ষার্থী নাঈম ইসলাম খান বলেন, ‘আমাদের সাথে র‌্যাব, পুলিশ কেউ ছিল না। প্রভোস্ট স্যার ক্যাম্পাসে বাইরে ছিলেন তখন। আমরা প্রক্টর স্যার, বঙ্গমাতা হলের হল সুপারের সহযোগিতায় মেয়েটিকে উদ্ধার করি। র‌্যাব কিভাবে উদ্ধার করেছে এ বিষয়ে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ফিরোজ আল হাসান বলেন, ‘র‌্যাব বা পুলিশ কারো সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ হয় নাই। কিছু ছাত্র ভোর রাতে ফোন করে আমাকে জানিয়েছে রাজশাহী থেকে একটি মেয়েকে অপহরণ করে আনা হয়েছে এবং বঙ্গমাতা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা হলের ২১৮ নং কক্ষে রাখা হয়েছে। আমি সাথে সাথে হল প্রভোস্টকে জানিয়েছি। প্রভোস্ট না থাকায় হল সুপারের মাধ্যমে মেয়েটির অবিভাবক মেয়েটিকে নিয়ে চলে যায়।’

এ খানে র‌্যাব বা পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কোনো রকম সংশ্লিষ্টতা ছিল না। র‌্যাব যদি দাবি করে প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়েছে এটা পুরোটাই বানোয়াট এবং মিথ্যা কথা। তাদের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ হয় নাই।

এ বিষয়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা হলে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মোহা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছিলাম। ঘটনাটি শুনা মাত্রই হল সুপারকে মাধ্যমে মেয়েটিকে তার পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। আমি ২২ ফেব্রুয়ারি নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছি হলে বহিরাগত বা অন্য হলের কোনো মেয়ে অবস্থান করতে পারবে না। করতে হলে হল প্রভোস্টের অনুমতি নিতে হবে। আমি এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করব। যারা জড়িত তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিব এবং তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন মোতাবেক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব। র‌্যাব তখন সেখানে ছিল না। তারা যেটা দাবি করছে এটা ভিত্তিহীন।’

প্রশাসনের দাবির প্রেক্ষিতে র‌্যাবের সাথে যোগাযোগ করা হলে নাটোরে র‌্যাব-৫ এর কোম্পানি কমান্ডার এএসপি যাযেদ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের টিম গোপন সংবাদের ভিত্তিতে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উনাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়।’

Related posts

Leave a Comment

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com