সারাদেশ 

একজন বঙ্গবন্ধু : স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা

একজন বঙ্গবন্ধু : স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা

আকাশে উদিত হবে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য। পরাধীনতার কারাগার থেকে বেরিয়ে জন্ম হবে একটি স্বাধীন দেশের। নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের মুক্তির দূত হয়ে এই বসুন্ধরায় আসবেন একজন মহানায়ক। ৭ কোটি মানুষকে দেখাবেন স্বাধীনতার স্বপ্ন, নেতৃত্ব দিবেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে। কিন্তু কে দেখাবেন সেই স্বপ্ন? বিধাতা আমাদের হতাশ করেননি। এই বাংলায় জন্ম হয়েছিল এক ক্ষণজন্মা পুরুষের। তিনি স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ, মধূমতির কোলঘেঁষা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় অভিজাত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম আমাদের স্বাধীনতার মহানায়কের।
শৈশবে বঙ্গবন্ধুকে আদর করে ডাকা হতো ‘খোকা’। ১৯৪১ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি এবং বিএ পাস করেন। ১৯৪৭ সালে কলকাতা ত্যাগ করে ঢাকা ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন।
কিশোর বয়স থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ১৯৪৩ সালে যোগ দেন বেঙ্গল মুসলিম লীগে। এখানেই সান্নিধ্যে আসেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। ১৯৪৮ সালে গঠন করেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ । ১৯৪৮ সালে ভাষার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই প্রথম প্রতিবাদ এবং ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয়, যা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে।
পঞ্চাশের দশক তার রাজনৈতিক উত্থানের কাল। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দূরদর্শী এক রাজনৈতিক নেতা। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগ ছেড়ে দেন এবং হোসেন সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর সঙ্গে মিলে গঠন করেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ।’ তিনি দলের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষিমন্ত্রী হন তিনি। ১৯৫৬ সালে কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৬৩ সালে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৬ দাবি পেশ করেন, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পরিপূর্ণ রূপরেখা উল্লিখিত হয়েছিল। ১৯৬৮ সালের প্রথমদিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে আন্দোলনকারী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করে বাঙালিরা।
১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে পূর্ব বাংলা।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন— ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর ডাকে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নামে আপামর জনসাধারণ।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। এ সরকারের অধীনেই গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী এবং শুরু হয় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী লড়াই। দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের প্রাণ ও লাখো নারীর আত্মবিসর্জনে অর্জিত হয় আমাদের স্বপ্নের স্বাধীনতা।
বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে স্বাধীন দেশ উপহার দিয়ে গেছেন। এই স্বাধীন বাংলা কে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলাটা আমাদের দায়বদ্ধতা। আজকে বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম জন্মবার্ষিকীতে সেই দায়বদ্ধতা পূরণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত হোক বাঙ্গালী জাতি। তার স্বপ্নের সোনার বাংলা বির্নিমানে নিক দীপ্ত শপথ।

Related posts

Leave a Comment

WP2FB Auto Publish Powered By : XYZScripts.com